চট্টগ্রাম শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১
চট্টগ্রাম শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

সাহিত্য

‘বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া’

জ্যোতির্ময় নন্দী
প্রকাশিত : রবিবার, ২০২৩ ফেব্রুয়ারী ২৬, ১১:০৭ পূর্বাহ্ন

১.

তখন তুর্কি শাসনামল। বাংলার মসনদ তখন সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ্-এর দখলে। ১৪৯৪-১৫১৯, এই ২৫ বছরের মোটামুটি লম্বা সময় ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। মুসলমান যোদ্ধাদের আগেপিছে পির-ফকিররাও তখন বঙ্গদেশে ঢুকছেন প্রবলভাবে, বিপুল সংখ্যায়। ভূমিপুত্র-কন্যারা, বিশেষ করে নিম্নবর্গীয়রা তখন ধর্মান্তরিত হচ্ছিলো দলে দলে। এটা ঠেকাতেই স্থানীয় সনাতনপন্থীদের মধ্যে থেকে এলো গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম।

 

এ ধর্মমতের প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু এতে সুকৌশলে ঢুকিয়ে দিলেন ইসলামের জিকিরের অনুসরণে নামকীর্তন, তসবিহ্'র অনুকরণে জপমালা ইত্যাদি। তবে মরুভূমিতে সৃষ্ট জিকিরের তুলনায় কীর্তনে অনেক বেশি রসসঞ্চার হলো সজল সরস বাংলার মাটি ও মানুষের গুণে। দরগাহ্'র অনুসরণে চৈতন্যদেব বানালেন আশ্রম, আশিক-মাশুক তত্ত্বের অনুসরণে খাড়া করলেন রাধা-কৃষ্ণ তত্ত্ব। শ্রীকৃষ্ণের প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস বিরচিত 'শ্রীমদ্ভাগবত'-এর পুরোটায় যার কোনো নামনিশানাই নেই, সেই রাধা চরিত্রকে তিনি খাড়া করে ফেললেন পুরুষোত্তম কৃষ্ণের প্রেমার্থী পরমাপ্রকৃতি হিসেবে। এ ব্যাপারে তিনি সাহায্য নিলেন তাঁর পূর্ববর্তী বড়ু চণ্ডিদাস, বিদ্যাপতি প্রমুখ পদকর্তা কবিদের রচনার। এই আশিক-মাশুক তত্ত্বে তিনি যুক্ত করলেন এই বাংলার সন্তান কপিলেরই উদ্ভাবিত সাংখ্য দর্শনের পুরুষ-প্রকৃতি তত্ত্ব। শুধু তাই নয়, মাধবাচার্য বা মধ্বাচার্যের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদানুসারী গোড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে তিনি আরো যুক্ত করলেন, এ অঞ্চলে ইতোপূর্বে প্রচলিত বৌদ্ধ, জৈন, নাথযোগী ইত্যাদি জনপ্রিয় ধর্মমতের সেরা কিছু জিনিসও।

 

সর্বজীবে করুণা, ক্ষমা, প্রেম ইত্যাদি ব্যাপাতে তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম জৈন-বৌদ্ধ ধর্মের ছায়া। বৌদ্ধ সঙ্ঘ, বিহার ইত্যাদির বদলে চৈতন্যদেব তাঁর অনুসারীদের দিয়ে গেছেন আখড়া আর মঠ।

 

উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত মানুষ ছিলেন চৈতন্যদেব। দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত অধ্যাপক। খুব ভেবেচিন্তেই তিনি বাংলার মানুষের ঐতিহ্যের সঙ্গে, মনমানসিকতার সাথে একেবারে খাপসই করে বানালেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মমত, যা বিপুল জনপ্রিয়তা পেলো। বাংলার মাটিতে কিছুটা মন্দীভূত হলো ইসলামের প্রচার-প্রসার। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হলো, চৈতন্যকে কেন্দ্র করে বাঙালির চৈতন্য যেন নতুন করে জেগে উঠেছিলো। বহুকাল পর বাংলার মানুষ এক বিশাল মহাপুরুষের মহাজীবনের প্রত্যক্ষদর্শী হলো। তাঁর প্রভাব এতদূর বিস্তৃত হলো যে, লোকে তাকে ঈশ্বরের অবতার ভাবতে শুরু করলো। নিজে ব্রাহ্মণ তথা ব্রাহ্মণ্য বৈদিক ধর্মের প্রতিভূ হয়েও তিনি তাঁর প্রবর্তিত ধর্মমতে ঘুচিয়ে দিলেন জাতপাতের ভেদরেখা। ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল-যবনকে বসিয়ে দিলেন এক কাতারে। তিনি ঘোষণা করলেন:

 

মুচি হয়ে শুচি হয় যদি হরি ভজে।

শুচি হয়ে মুচি হয় যদি হরি ত্যাজে।

 

অর্থাৎ, নিম্নবর্গীয় মুচির ঘরে জন্ম নিয়েও কেউ যদি হরিভজনা করে সে শুচিপবিত্র হয়ে যাবে। আর শুচিপবিত্র উচ্চবংশজাত হয়েও কেউ যদি হরিভজনা ত্যাগ করে সে মুচিতুল্য অপবিত্র হয়ে যাবে।

 

প্রেমোন্মাদ সাধক শ্রীচৈতন্য বাঙালির আবেগের দুয়ার প্রথম বারের মতো খুলে দিয়েছিলেন হাট করে। তাঁকে কেন্দ্র করে নতুন করে গড়ে উঠেছিলো বাঙালির একান্ত নিজস্ব অহঙ্কারের জিনিস পদাবলী কবিতা ও কীর্তন। কোলকাতাকেন্দ্রিক রবীন্দ্রনাথের আগে গ্রাম্যতাদোষমুক্ত, সত্যিকারের নাগরিক পরিশীলনযুক্ত কোনো সাহিত্যের কথা বলতে গেলে এই নদীয়াকেন্দ্রিক বৈষ্ণব সাহিত্যের কথাই বলতে হবে। শুধু গান বা কবিতা নয়, কড়চা আকারে এ সময়ে প্রাক্-ব্রিটিশামল গদ্য লেখালেখিরও সূচনা হয়েছিলো।

 

পাশাপাশি গ্রামীণ প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে প্রচলিত বাউল-ফকিরি ঘরানাত ধর্মমতগুলোকেও প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে চৈতন্যদর্শন। লালন সাঁইয়ের অনুসারী হোক বা সতীমায়ের বা কর্তাভজা সম্প্রদায়ের, যেখানকারই হোক না কেন, সবাই নদীয়ার গোরাচাঁদকে তাদের আদিগুরু বলে জানে এবং মানে। চৈতন্যের অনুসারী যখন মঠে আখড়ায় মহারাজ বাবাজি হয় বা লস অ্যাঞ্জেলেসে রাধাকৃষ্ণের সুবিশাল মন্দির তোলে বা মহারথযাত্রার আয়োজন করে বা বিশ্বব্যাপী কৃষ্ণ কনশাসনেস সংগঠন গড়ে তোলে, তখন আজও কোনো অখ্যাত, অজ্ঞাত, সুদূরের পল্লীতে বৈরাগী ভিখিরি মন্দিরা আর গুপিযন্ত্র বাজিয়ে রাধাকেষ্টর নামগান করে ভিক্ষা চায়। অসাম্প্রদায়িক, মানবমুখী, ধর্মসমন্বয়কামী বাংলার আত্মার প্রতিরূপ বাউল-ফকিরদের সঙ্গে ওই বৈষ্ণব বৈরাগী-বৈরাগিনীদের তেমন কোনো তফাৎ চোখে পড়ে না।

 

চৈতন্যদেবের দর্শন শুধুমাত্র বাংলা নয়, বৃহত্তর ভারত তথা বিশ্বেরও চৈতন্য উদ্রেককারী হতে পারে, যদি তা ঠিকমতো অধ্য্যন, অনুধ্যান, অনুশীলন ও অনুসরণ করা যায়। গোরা পাগলাই প্রথম আমাদের শিখিয়েছেন জীবে দয়া আর নামে রুচির কথা, ঘাসের চেয়েও বিনয়ী আর গাছের চেয়েও সহিষ্ণু হওয়ার কথা। দ্বিজ চণ্ডিদাসের বকলমে তিনিই ডাক দিয়ে বলেছেন:

 

শোনো হে মানুষ ভাই,

সবার ওপরে মানুষ সত্য,

তাহার ওপরে নাই।

 

কবি সত্যেন্দ্রনাথ ঠিকই লিখেছেন: "বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া।"

 

২.

শিক্ষাষ্টকম

 

বাংলার ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিসবকিছুতেই শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য, ওরফে চৈতন্য মহাপ্রভুর অবদান নিয়ে নতুন করে বা বাড়িয়ে বলার অবকাশ কিছু নেই। তাঁকে নিয়ে সংস্কৃত, বাংলা, অন্যান্য ভারতীয় ভাষা, এমনকি ইংরেজি প্রভৃতি বিদেশি ভাষায়ও বহু সাহিত্য, কবিতা, গান রচিত হয়েছে, কিন্তু তাঁর নিজের রচনা বলতে পাওয়া গেছে শুধুমাত্র শিক্ষাষ্টকম নামের আটটি সংস্কৃত শ্লোক, যেগুলোর মধ্যে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের তথা ভক্তিবাদের মূলসূত্র নিহিত বলা যেতে পারে।

 

ভক্তি-প্রেমধর্মের স্বরূপ শিক্ষাত্মক আটটি শ্লোকের সমন্বয়ে এই শিক্ষাষ্টক রচিত। ইচ্ছে ছিলো, কবিতাকারে শ্লোকগুলোর অনুবাদ করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সময়াভাবে গদ্যাকারেই অনুবাদ করলাম। সঙ্গে বাংলা হরফে মূল সংস্কৃত শ্লোকগুলোও রইলো।

 

১.

চেতো-দর্পণ-মার্জনম ভব-মহা-দাবাগ্নি-নির্বাপণম।

শ্রেয়-কৈরব-চন্দ্রিকা-বিতরণম বিদ্যা-বধূ-জীবনম ॥

আনন্দাম্বুধি-বর্ধনম প্রতি-পদম পূর্ণামৃতাস্বাদনম।

সর্বাত্ম-স্নাপনম পরম বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণ-কীর্তনম ॥


বাংলায়: চেতনাদর্পণ মার্জনাকারী, ভবজীবনের মহাদাবাগ্নি নির্বাপণকারী, শ্রেষ্ঠ আশিসপূত চন্দ্রালোক বিতরণকারী, প্রতি পদে পূর্ণ অমৃতের আস্বাদন প্রদানকারী, সম্পূর্ণ আত্মাকে স্নাত-ধৌতকারী শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের জয় হোক।

 

২.

নাম্নাম আকারী বহুধা নিজ-সর্বশক্তিস্

তত্রার্পিতা নিয়মিতঃ স্মরণে ন কালঃ।

এতাদৃশি তব কৃপা ভগবান মমাপি

দুর্দৈবম ঈদৃশম ইহাজনি নানুরাগঃ।

 

বাংলায়: ভগবান, তোমার বহু নাম, তোমার সকল শক্তি সেসব নামে নিহিত, তবুও আমি সে-নাম নিয়মিত স্মরণ না-করেই কাল কাটিয়ে দিয়েছি। আমার ওপর তোমার এমন কৃপা, অথচ কী দুর্দৈব, তবুও তোমার নামে আমার অনুরাগ হলো না!

 

৩.

তৃণাদপি সুনীচেন

তররোপি সহিষ্ণুনা।

অমানিনা মানদেনা

কীর্তনীয়ঃ সদা হরি ॥

বাংলায়: তৃণের চেয়েও নিচু হও, তরুর চেয়েও সহিষ্ণু হও, মানহীনকে মান দাও, সদা হরিনাম কীর্তন করো।

 

৪.

ন ধনম্ ন জনম্ ন সুন্দরীম্

কবিতাম্ বা জগদীশ কাময়ে।

মম জন্মনি জন্মনি ঈশ্বরে

ভবতদ্ ভর্ক্তি অহৈতুকি ত্বয়ি ॥

 

বাংলায়: হে জগদীশ্বর, আমি ধন, জন, সুন্দরী, কিংবা কবিতাকিছুই চাই না। শুধু যেন জন্ম জন্ম ধরে ঈশ্বরের ওপর আমার অহৈতুকি (কোনো পুরস্কারের আশা ছাড়াই) ভক্তি থাকে।

 

৫.

অয়ি নন্দতনুজ কিঙ্করম্

পতিতম্ মাম বিষমে ভবাম্বুধৌ।

কৃপয়া তব পদপাদপঙ্কজ-

স্থিত-ধূলিসদৃশম্ বিচিন্ত্য ॥

 

বাংলায়: হে নন্দপুত্র কৃষ্ণ, তোমার দাস আমি বিষম ভবসাগরে পতিত হয়েছি। আমাকে তোমার চরণপদ্মের ধূলিসদৃশ বিবেচনা করে উদ্ধার কর।

 

৬.

নয়নম গলদশ্রুধারায়া

বদনম গদ্গদ-রুদ্ধয়া গিরা।

পুলকইর্নিচিতম্ বপুঃ কদা

তব নাম গ্রহণে ভবিষ্যতি ॥

 

বাংলায়: হে ঈশ্বর, তোমার নাম নিতে নিতে কখন আমার দুচোখ দিয়ে অবিরাম অশ্রুধারা বয়ে যাবে, কণ্ঠস্বর গদগদ রুদ্ধ হয়ে আসবে, পরম পুলকে কম্পমান হবে সারা শরীর?

 

৭.

যুগায়িতম নিমেষেন

চক্ষুসা প্রবৃষায়িতম।

শূন্যায়িতম জগৎ সর্বম

গোবিন্দ বিরহেন মে ॥

 

বাংলায়: গোবিন্দের বিরহে আমার এক নিমেষকে মনে হচ্ছে এক যুগ, আমার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা ঝরছে বৃষ্টির মতো, শূন্য মনে হচ্ছে সারা জগৎ।

 

৮.

আশ্লিষ্য বা পাদরতাম পিনষ্টু মাম।

অদর্শনম মর্মাহতম্ করোতু বা ॥

যথা তথা বা বিদধাতু লম্পটো।

মৎ প্রাণনাথস্ তু স এব না পরা ॥

 

বাংলায়: আশ্লেষে আমাকে আলিঙ্গন কর বা পায়ের নিচে পিষ্ট কর, অদর্শনে আমাকে মর্মাহত কর বা যেখানে সেখানে লাম্পট্য করে বেড়াও, হে কৃষ্ণ, তুমি ছাড়া আর কেউ আমার প্রাণনাথ নয়।

 

কৃষ্ণদাস কবিরাজ বিরচিত মহাপ্রভুর জীবনী চৈতন্য চরিতামৃত-এ শিক্ষাষ্টকম উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে

 

প্রভুর শিক্ষাষ্টক শ্লোক যে-ই পড়ে, শুনে

কৃষ্ণপ্রেমে ভক্তি তার বাড়ে দিনে দিনে।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Video