চট্টগ্রাম শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১
চট্টগ্রাম শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১

উপকুল

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ৪৫ গুণ বাড়লেও জেলেদের জীবনমানের কোনো উন্নতি হয়নি। সামগ্রিকভাবে জেলেরা বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি জেলেরা

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত : রবিবার, ২০২২ সেপ্টেম্বর ১৮, ০৬:৪১ অপরাহ্ন
মিরসরাইয়ের ডোমখালী সমুদ্র উপকূলে নৌকা থেকে মাছ তুলে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রেখেছেন জেলেরা।

 

নদীমাতৃক দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। কথায় আছে আমরা মাছে-ভাতে বাঙালী। বাঙালীর ঐতিহ্যগাঁথা চরিত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য অভিনেতা হচ্ছেন জেলেরা। জীবন-জীবিকার তাগিদে এবং আমাদের আমিষ খাদ্য চাহিদা মেটাতে দিন-রাত যে জেলেরা বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রতিনিয়ত জীবনপণ লড়াই করে যাচ্ছে মৎস্য আহরণে। সমুদ্রে মাছ ধরে দেশের মানুষের আমিষ জোগায়, সেই জেলেদের জীবন কীভাবে কাটে? তারা কি ন্যায্য পাওনাটুকু পাচ্ছে? সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় -

 

বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় মিরসরাই-সীতাকুন্ড এলাকার মাঝামাঝি ডোমখালী স্লুইচ গেট এলাকা। নদীর কূলে সারিসারি বাঁধা রয়েছে মাছ ধরার নৌকা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আরো কিছু নৌকা মাঝ নদীতে রয়েছে। মাছ ধরছে তারা। সন্ধানাগাদ তীরে ফিরবে মাছ নিয়ে। বিকাল থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে জড়ো হচ্ছেন নদীরকূলে মাছ কিনতে। এদিকে স্থানীয় পাইকার ব্যবসায়ীরাও সিএনজি অটোরিক্সাযোগে আসছেন মাছ কেনার জন্য। সন্ধা হয়ে এলে একটা একটা করে নৌকা ভিড়তে থাকে কিনারে। আর সাথে সাথে মাছক্রেতা ও পাইকরারা ঝাঁপিয়ে পড়েন মাছ কেনার জন্য। তবে সাধারণ মানুষ যারা আসেন মাছ কেনার জন্য, তারা বড় মাছ বা পছন্দের মাছ থাকলে কিনেন। না হয় অন্য মাছ কিনেন না।

 

এদিন দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি নৌকাতে মাছের ঝুড়িগুলো ছোট চেঁউয়া মাছে ভরা। মাছভর্তি প্রতিটি ঝুড়ি বিক্রি হচ্ছে ২শ হতে ২শত ৫০ টাকায়। এক নৌকায় ৪-৫টি ঝুড়ির বেশি মাছ থাকেনা। সব মিলিয়ে এক নৌকার মাছ বিক্রি হয় প্রায় ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকায়। অথচ পাইকরারা এই মাছ খুচরা বাজারে ৪-৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে।

 

একটি নৌকাতে ২জন জেলে থাকেন। তাদের সারাদিনের পরিশ্রম সাথে নৌকার জালানি তেল। সব মিলিয়ে কিভাবে পোষায় এমন প্রশ্নের জবাবে সজল জলদাশ বলেন, কোনভাবেই পোষায় না। বাপ-দাদার পেশা, লেখা পড়া শিখি নাই। এই পেশা ছাড়তেও পারছি না। কোনরকমভাবে জীবন অতিবাহিত করা। এত কমদামে মাছ কেন বিক্রি করেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কি করবো। আমরা যে বাজারে নিয়ে মাছ বিক্রি করবো সেই সুযোগতো নেই। কেননা এখান থেকে লোকাল কোন গাড়ী নেই। রিজার্ভ গাড়ী নিয়ে গেলে, আর বাজারে বসে খুচরা বিক্রি করলে আমাদেরও পোষাবে না। এখানে পাইকার যারা আসে তাদের কাছে বিক্রি না করেও উপায় নেই। তারা না কিনলে এই মাছ নদীতে ফেলে দিতে হবে। অনেকটা বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেনে, আমাদের জীবনটাই অভিশপ্ত।

 

মিরসরাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাছিম মাহমুদ বলেন, উপকূলীয় জেলেদের সরকারের পক্ষ থেকে বছরে ৩ ধাপে খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়। ঝাটকা না ধরার সময়, সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় এবং বছরের যে সময় তাদের কাজ থাকেনা। এছাড়া গত বছর থেকে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং সেগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মাছের সঠিক মূল্য পেতে যাতে সরাসরি মাছগুলো বাজারজাত করতে পারে, সেজন্য নিজেরা একটি সংগঠন করে তাদের মাধ্যমে মাছগুলো বাজারজাত করতে পারলে হয়তো তারা উপযুক্ত মূল্য পাবে।

 

জেলেদের বছরের একটা সময় বেকার বসে থাকতে হয়। সে সময় তাদের সঞ্চয় বলে কিছু থাকে না। ফলে মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চসুদে ঋণ নিয়ে তাদের জীবন বাঁচাতে হয়। জেলেরা প্রতিনিয়ত যে সমস্যার সম্মুখীন হয়- তা হলো সমুদ্রে নিরাপত্তাহীনতা। জলদস্যুদের আক্রমণের শিকার হয়ে নৌকা, জালসহ সহায়-সম্পদ এমনকি জীবনহানি। সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার দায়িত্বে কোস্টগার্ড থাকলেও কমছে না জলদস্যুদের উৎপাত। 

 

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ৪৫ গুণ বাড়লেও জেলেদের জীবনমানের কোনো উন্নতি হয়নি। সামগ্রিকভাবে জেলেরা বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। উপকূলীয় জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি দেখতে হবে আর্থসামাজিক উন্নয়নের নিরিখে। জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। জেলেরা যাতে মহাজনদের ঋণচক্রে আবদ্ধ না থাকেন, সে জন্য তাদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের সন্তানদের শিক্ষিত করতে জেলে পল্লীগুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদেরকেও উন্নত জীবন উপভোগ করার সুযোগ দিতে হবে বলে মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকরা।


- নাছির উদ্দিন/মিরসরাই

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Video