বন্দর নগরী চট্টগ্রাম দেশের অন্যান্য নগরী থেকে স্বতন্ত্র। অসম্ভব রূপবতী এই নগরীর প্রেমে না পড়ে যেন উপায় নেই! একদিকে উচুঁ উচুঁ পাহাড়, অপরদিকে উত্তাল সমুদ্র। পাহাড়ের গায়ে সবুজ গাছপালা আর লতাপাতার সমারোহ। মূলত পাহাড়, পাহাড়ের পাদদেশে সমতল ভূমি, এই সমতল ভূমিতে গড়ে ওঠা সভ্যতা, উঁচুনিচু ঢালু পথ, কর্ণফুলী নদী, সমুদ্রের মোহনা-- সবকিছু চট্টগ্রামকে এমন এক নৈসর্গিক সৌন্দর্য দিয়েছে যে, সেখান থেকে চোখ ফেরানো দায়। বিশেষ করে আমরা, যারা বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রামের বাইরে জন্মের কারণে ওদের ভাষায় ‘বইঙ্গা বা বিদেশ্যা’, তাদের কাছেও চট্টগ্রামের সৌন্দর্য অতুলনীয়।
আমি ১৯৮৪ সালে প্রথম
যখন চট্টগ্রাম যাই তখন আমার বয়স ১৬ অথবা ১৭। সবার অগোচরে শাহ আমানতের মাজারে গিয়ে
টুক করে সুতা বেঁধে মানত করলাম-- আমার যেন চট্টগ্রাম বিয়ে হয়। ঐ বয়সটা এমনই-- কোনো
চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, হিসেব-নিকেশ নেই, মনে যা আসে তাই চাওয়া যায়! অবশেষে সত্যি
সত্যিই আমার মনের আশা পূরণ হলো। চট্টগ্রাম আমার শ্বশুরবাড়ি। আমি ভীষণ খুশি
হয়েছিলাম প্রথমে। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম, জানলাম শুধুমাত্র বাহ্যিক
সৌন্দর্যে নয় এখানকার সংস্কৃতি, কৃষ্টিতেও ভিন্নতা রয়েছে। বন্দর নগরী হওয়ার কারণে
এখানে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকেদের সমাগম ঘটেছে। জন্ম হয়েছে এক
মিশ্র সভ্যতার। এছাড়া সমুদ্র পার্শ্ববর্তী হওয়ার কারনে ঝড়-ঝঞ্ঝা, সাইক্লোনসহ
বিভিন্ন প্রকৃতিক দুর্যোগের সাথে এক রকম লড়াই করে এদের জয়ী হতে হয়েছে। এজন্য চট্টগ্রামের
মানুষ নির্ভীক, সাহসী এবং সমুদ্রের মতো বিশাল মনের অধিকারী।
এখানকার মানুষের মনের
বিশালত্বের অপর কারণটি হচ্ছে সহজ বাণিজ্য পন্থা এবং কৌশল। এজন্যই চট্টগ্রাম
বাংলাদেশের বাণিজ্য নগরীও বটে। বাংলাদেশে যত বড় বড় ব্যবসায়ী আছেন বেশিরভাগেরই
বাস চট্টগ্রাম অঞ্চলে। শুধু মাত্র ব্যবসা
বাণিজ্য না, কৃষিক্ষেত্র, রাবার চাষ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আর্থ সামাজিক উন্নয়নে
বিভিন্ন শিল্প কারখানা- সব কিছুতেই চট্টগ্রাম স্বয়ংসম্পূর্ণ। এছাড়া বিদেশি
রেমিট্যান্সেরও সিংহভাগ আসে এই চট্টগ্রামের প্রবাসীদের ঘামে ভেজা টাকা থেকে।
চট্টগ্রামের মানুষের আছে আলাদা ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি। মেজবানের কথা আলাদা করে আর
নাইবা বললাম। দেশের হাজার হাজার মানুষ মুখিয়ে থাকে, অপেক্ষা করে এই মেজবান খাওয়ার
জন্য। চট্টগ্রামের মেজবানকে শুধুমাত্র খাওয়া বললে ভুল বলা হবে। এটা ঐতিহ্য আর
সম্প্রীতির বন্ধন। সকলের মিলন মেলা। এছাড়া চট্টগ্রামের আছে বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক
ইতিহাস। বীর বাঙালির অহংকার চট্টগ্রামের বিপ্লবী কৃতী সন্তান সূর্য সেন এবং
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তাদের নির্মোহ আত্মদান দেশ ও জাতি
শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। ৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলনের প্রথম জনসভা লালদিঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত
হয়। এই ধারাবাহিকতায় ২৬ শে মার্চ ১৯৭১-এর কালরাত্রিতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে
প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা করা হয়। কবি সাহিত্যিক মওলানা মনিরুজ্জামান
ইসলামাবাদী, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ‘একুশ মানে মাথা নত না
করা’র লেখক কথাশিল্পী আবুল ফজল, ভাষা আন্দোলনের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে
আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’র কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী- এরা সবাই চট্টগ্রামের সন্তান, এদেশের
গৌরব।
যা বলছিলাম, এখানকার
সংস্কৃতিতে খানিকটা ভিন্নতা রয়েছে। ভিন্নতার প্রতি মানুষের আগ্রহ এবং কৌতূহলের শেষ
নেই। ঢাকায় এক পরিচিত আড্ডায় চট্টগ্রামের প্রাত্যহিক আচার-আচারণ, খাদ্যাভ্যাস,
যৌতুক প্রথা অর্থাৎ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে কথা হচ্ছিল। যৌতুকের কথা উঠতেই আমার
মেয়ে বলল, তুমি কিছু বলো। কারণ আমিও চট্টগ্রামেরই মেয়ে। আমার স্বামী, ছেলেমেয়ে
চট্টগ্রামের সন্তান। তাছাড়া চট্টগ্রামের সাথে আমার গভীর প্রেমের সম্পর্ক। এজন্য
আমি ‘বিদেশ্যা’ হলেও চট্টগ্রামের দুর্নাম সহ্য করতে পারি না। কিন্তু চট্টগ্রামের
যৌতুক প্রথা নিয়ে আমার মনেও খানিকটা খচ্-খচানি আছে। বাবা-মা বা পরিবারের সামর্থ্য
থাকলে ঠিক আছে, কিন্তু যাদের নাই, তাদেরও ভিটা-মাটি বন্ধক রেখে অথবা বিক্রি করে
মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিতে হবে এটা কেমন কথা? শুধু যে বিয়ের সময় দিয়েই ক্ষান্ত তা
কিন্তু নয়। সারা বছর ধরেই মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি তত্ত্ব পাঠাতে হবে।
জ্যৈষ্ঠ মাসে ফল, শীতের মৌসুমে পিঠা, রোজায় ইফতারি, মহররমে বিরিয়ানি, রোস্ট,
রেজালা, কোরবানি ঈদে গরু, ছাগল না হলে
অন্তত গরুর রান-- এতে করে নাকি মেয়ের ইজ্জত বাড়ে, মেয়ে সুখে থাকে। প্রজন্ম থেকে
প্রজন্মান্তরে মেয়ের সুখের জন্য বাবা-মার এমন বলিদান আর কতদিন? কবে এরা
সম্পদশালীদের সাথে এই অসম প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়াবে? অথবা হতে পারে ছেলে অথবা
মেয়ে যারা স্বামী-স্ত্রী তারাই প্রতিবাদী হবে, রুখে দাঁড়াবে এই অন্যায় প্রথার
বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশের অন্যান্য
জায়গায় যে যৌতুক প্রথা নেই তা নয়। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই এক দুজন যৌতুকের
বলি দেখা যায়। কিন্তু তাই বলে চট্টগ্রামে যৌতুক প্রথা থাকবে কেন? চট্টগ্রাম তো
তিলোত্তমা নগরী! একদিকে পাহাড়ের বিশালতা অপরদিকে সমুদ্রের বিশালতা। এই বিশালত্বের
মাঝে থেকেও মানুষের মন কেন ক্ষুদ্রতা স্পর্শ করবে? আমি ‘বিদেশ্যা’
হওয়া সত্ত্বেও চট্টগ্রামের প্রতি, এখানকার মানুষের আচার-ব্যবহার, রীতিনীতির প্রতি
ভালবাসা বা শ্রদ্ধার কমতি ছিল না। শুধু এই যৌতুক প্রথাটাকে আমি কখনও সাদা চোখে
মেনে নিতে পারিনি। আমাকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, এটা চট্টগ্রামের পুরনো
ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। কিন্তু ঘুরে ফিরে আমার মাথায় বারবার একটি প্রশ্নই এসেছে, এ
কেমন প্রথা যেখানে মেয়ের দাম, তার সম্মান নির্ণিত হয় তার পরিবারের মানুষদের
আত্মত্যাগের নিরিখে আর তাদের কষ্টের বিনিময়ে? একটি পরিবারে যখন একটি কন্যা
সন্তানের জন্ম হয়; পিতার আদরে, মায়ের মমতার আঁচলে সে বেড়ে উঠে। মেয়েটির সুখের জন্য
পিতা-মাতা সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু একটি মেয়েকে মূল্যায়নের
ক্ষেত্রে তার বেড়ে ওঠা, তার আচার-ব্যবহার, শিক্ষা, মূল্যবোধ সবকিছু ছাড়িয়ে যৌতুকের
প্রশ্ন আসবে কেন? আমি ভেবে পাই না এতে করে কি মেয়েটি সম্মানিত হয় নাকি অসম্মানিত?
অনেকবার অনেককে জিজ্ঞেস করেও সদুত্তর পাইনি।
বেশির ভাগ মানুষ মনে
করে, যৌতুক মেয়েটিকে সুখী করে। তার মানে দাঁড়ায়, সুখী হতে মেয়েটির গুণের প্রয়োজন
হয় না, শুধুমাত্র পিতা কিংবা পরিবারের টাকাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশটা
তো মুসলিম আধ্যুষিত দেশ। এখানে অনেক আইন কানুন ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করে প্রণিত
হচ্ছে। ইসলামে নারীকে দেনমোহর দিয়ে বিয়ের কথা বলা হয়েছে। যৌতুক শুধু সমাজ নয় ইসলাম
ধর্মেরও পরিপন্থী। তাহলে এ দেশে যৌতুকের প্রচলন হলো কবে থেকে? তবে কি হিন্দু,
মুসলিম মিশ্র সংস্কৃতি থেকে এই প্রথার প্রচলন হয়েছে? আমি এমনিতেই বইঙ্গা, তার ওপর
বিয়ে করেছি বাবা-মা, পুরো পরিবারের অমতে। যখন আমার পরিবার থেকে কিছু পাঠাতে চাইতো
আমি আমার এবং আমার স্বামীর ব্যক্তিত্ব এবং সম্মান রক্ষার্থে নিষেধ করতাম।
যখন আমি নিজে অর্থ
উপার্জন করতে শিখলাম তখন একবার ভাবলাম আমি আমার স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সবাইকে
বঞ্চিত করেছি। কারণ ওদের অভ্যস্থতা, চিন্তাধারা, মূল্যবোধ আমার থেকে আলাদা। আমি স্বামীকে বললাম, আমাদের বিয়ে হয়েছে ১৭ বছর।
আমি একেবারে ঋণ শোধ করতে চাই। ১৭টা গরু দান করবো এবার কোরবানিতে। ওর মুখ খুশীতে
উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল ‘শুধু গরু দিলে হবে না, সাথে চাল, ডাল, মশলা, বাবুর্চি খরচও দিতে
হবে।’ আমি রাজী হলাম। কিন্তু শুধুমাত্র মানুষ রাজী থাকলে কিছু হয় না।
স্বয়ং আল্লাহ্ যেখানে রাজী না সেখানে কিছুই সম্ভব নয়। কোরবানি ঈদের ৭ দিন আগে ধরা
পরলো ওর ব্রেইন টিউমার। আমরা সাধারণ মানুষ। কতই আর ক্ষমতা আমাদের। যে আল্লাহর
প্রিয় হবে, তাকে ডাকলেই চলে যেতে হবে। আমার স্বামীকেও তাই সময়ের আগেই চলে যেতে
হয়েছে। যাই হোক, আমি যৌতুকবিরোধী বলেই হয়ত আল্লাহ পাক আমার এই দান গ্রহণ করেননি।
চট্টগ্রাম শুধু তিলোত্তমা,
বাণিজ্য নগরীই নয়, বারো আউলিয়ার শহর। সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে
অলি-আউলিয়ারা জাহাজযোগে চট্টগ্রামে এসে ধর্মপ্রচারে ব্রতী হন পাহাড়ের চূড়ায়,
নির্জনতায়। এ জন্য শুধুমাত্র প্রকৃতিগতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, মহান আল্লাহ পাকের
অশেষ দয়া বর্ষিত আছে এই চট্টগ্রামের উপর-- এটা আমার মতো অনেকেই বিশ্বাস করে। তাহলে
এখানে অনাচার, অবিচার, অসামঞ্জস্য থাকবে কেন? তিলোত্তমা নগরী চট্টগ্রামকে কি তা
মানায়? মানায় না।
মন্তব্য করুন