সোনালি ঐতিহ্যে ভরপুর চট্টগ্রাম। প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রাম সমৃদ্ধ ও স্বতন্ত্র লোকসংস্কৃতির অঞ্চল হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাত। আকার-আকৃতিতে অন্য দশজন বাঙালির মতো হলেও সংস্কৃতিক চরিত্রে চট্টগ্রামের মানুষ বৈচিত্রময় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। বিশেষ করে চট্টগ্রামের লোকসংস্কৃতি বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল হতে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী, স্বতন্ত্র ও অভিনব। বিশ্বায়নের প্রভাবে যখন সমগ্র বিশ্বের লোকসংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে, তখনো চট্টগ্রামের অধিকাংশ লোকসংস্কৃতি সমহিমায় সমুজ্জ্বল।
লোকালয়ে বসবাসকারী মানুষকে লোক বলে অভিহিত করা হয়। লোকসম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস এবং ভাষা-সাহিত্য, আচার-আচরণ, জীবনযাপন প্রণালী ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে মানুষের সংস্কৃতি। দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। কোনো দেশের জাতীয় সংস্কৃতির ধারা প্রধানত দুটি: নগর বা শহুরে সংস্কৃতি আর গ্রামীণ বা লোকসংস্কৃতি। বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান রাষ্ট্র হবার কারণে বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নিজস্ব জীবনপ্রণালীর মাধ্যমে হাজার হাজার বছর ধরে যে বহুমুখী ও বিচিত্রধর্মী সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে, তা-ই বাংলার লোকসংস্কৃতি নামে পরিচিত। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল হতে চট্টগ্রামের লোকসংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। চট্টগ্রাম বলতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি) লোকসংস্কৃতি প্রায় এক ও অভিন্ন। বাংলাদেশে বসবাসরত ৩২টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকাংশই চট্টগ্রামে বসবাস করে। তাদের লোকসংস্কৃতি আরো বৈচিত্র্যপূর্ণ।
চট্টগ্রামের ভূ-প্রাকৃতিক
অবস্থান এবং প্রাচীন সমুদ্র বন্দর হওয়ার কারণে এখানে বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতির
সম্মেলন ঘটে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে প্রাচীনকালে নানান সম্প্রদায়ের লোক
চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর হয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে
বিশ্বের বৃহত্তম চারটি ধর্মের ( বৌদ্ধ, খ্রিস্টান,
ইসলাম, হিন্দু) অভূতপূর্ব সম্মেলন ঘটেছে
বৃহত্তর চট্টগ্রামে। দীর্ঘদিন আরকানি মগ শাসনের পর সপ্তম শতাব্দীতে হরিকেল রাজ্য
স্থাপিত হয় চট্টগ্রামে। সপ্তম ও অষ্টম শতকে ইসলাম ধর্মের ধর্মপ্রচারক সুফি-সাধকদের
আগমনের পর চট্টগ্রামে সুলতানি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ আড়াইশো বছরের
সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে পুনরায় আরকানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্যযুগের বাংলা
সাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করলে চট্টগ্রামে দীর্ঘ আরকানি শাসনের চিত্র ফুটে
উঠে। প্রায় এক শতাব্দী পর শায়েস্তা খাঁর হাত ধরে মগ শাসনের কবল হতে চট্টগ্রাম
মুক্ত হয় এবং নতুন নামকরণ করা হয় ইসলামাবাদ। উপমহাদেশে ইংরেজদের হাতে মোগল শাসনের
অবসান ঘটলে অন্যান্য অঞ্চলের মতো চট্টগ্রামেও ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়। উপমহাদেশে
ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম শুরু হলে ইংরেজরা চট্টগ্রামে বড় ধরণের প্রতিরোধের সম্মুখীন
হয়। মাস্টার দা সূর্যসেন, বিপ্লবী বিনোদ বিহারীদের
সংগ্রামী ঐতিহ্য এখনো চট্টলবাসীর প্রেরণার উৎস। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি-তত্ত্বের
ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র হলে চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের অংশে পড়ে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো চট্টগ্রামের মানুষও মুক্তি সংগ্রামে
ঝাঁপিয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের অসংখ্য মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পাশ্ববর্তী মায়ানমারের
আরকান রাজ্যে আশ্রয় নেয়, যা ‘মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র’,
৩য় খ-ের ৫৩ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে।
দীর্ঘ সংগ্রাম, মিশ্র সংস্কৃতির সংমিশ্রণ চট্টগ্রামকে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যের
অধিকারী করে তোলে। আঞ্চলিক ভাষা, পুঁথি সাহিত্য, মেজবানি, বলিখেলা, গরুর
লড়াই, মোরগের লড়াই, কবির গান,
আঞ্চলিক গান, ভাণ্ডারী গান, নদীতে চলাচলের সাম্পান, শুঁটকি মাছ, বেলা বিস্কুট-রঙ-চা ইত্যাদি লোকজ সংস্কৃতি চট্টলার মানুষ আজো ধারণ করে
আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাষা, বৈসাবি উৎসব, জলখেলা, ফানুস উড্ডয়নসহ অসংখ্য লোকজ সংস্কৃতি এখনো বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার
মাধ্যমে লালিত-পালিত হয়। চট্টগ্রামের সবচেয়ে বৈচিত্রময় সংস্কৃতি হলো খাবার,
খাদ্যাভ্যাস এবং ভাষা। চট্টগ্রামের মানুষ আতপ চালের ভাত খায়,
খাঁটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। অবশ্য সিলেটের সাথে চট্টগ্রামের
ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয়
আচার-অনুষ্ঠানের কিছুটা মিল আছে। এর কারণ হলো, বাংলাদেশে
ইসলামের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত সিলেট ও চট্টগ্রাম। মুসলিম ধর্মীয় সুফি সাধকগণ
এতদাঞ্চলে দীন প্রচারের উদ্দেশ্যে সিলেট এবং চট্টগ্রামকে প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহার
করেছেন। চাটগাঁইয়া মানুষের ভাতের সাথে তরকারিও বৈচিত্র্যময়। টাকি, টেংরা, রুই, কাতলার
সাথে সবজি মিক্স করে খেতে অভ্যস্ত দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের রান্না দেখলে
অনেক চাঁটগাইয়ার বমি চলে আসতে পারে।
খাবারের মধ্যে চট্টলার
ঐতিহ্যবাহী মেজবানি এবং শুঁটকি বিশ্বখ্যাত। মেজবানি এখানকার প্রাচীন সংস্কৃতির
অংশ। মধ্যযুগের (১৫০০ – ১৬০০শতাব্দীর) প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যে ‘মেজোয়ানী’ ও
‘মেজমান’ শব্দ দু’টির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মেজোয়ানি অর্থ আপ্যায়নকারী ও মেজমান
অর্থ আপ্যায়ন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের অনেক অভিজাত রেস্টুরেন্টে মেজবানির খাবার বিক্রি
করা হয়।
বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের
বাইরের বাংলাভাষী অঞ্চলের লোক চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা শুনে মনে করতে পারে, হিব্রু শুনছি নাকি! হিব্রুর কথা এজন্যই বললাম যে, হিব্রু ইহুদিদের নিজস্ব ভাষা। অন্য কেউ হিব্রু শিখুক বা বলুক তা
ইহুদিরা চায় না। মৃতপ্রায় হিব্রু ভাষাকে বিশ্বব্যাপী জীবিত রেখেছে ইহুদিরা। তবে
চাটগাঁইয়া ভাষা হিব্রুর মতো কঠিন হলেও কেউ এটি শিখতে চাইলে উদারতার জন্য বিখ্যাত
চট্টলবাসী আপত্তি করে না। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও অভিনবত্ব
সম্পর্কে প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক ও সমালোচক বুদ্ধদেব বসু বলেছেন,
“আর কোথাও শুনিনি ঐ ডাক, ঐ ভাষা,
ঐ উচ্চারণের ভঙ্গি। বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের ভাষা
বৈশিষ্ট্য বিস্ময়কর। চাটগাঁর যেটা খাঁটি ভাষা, তাকে তো
বাংলাই বলা যায় না।” যাহোক, ভাষা হিসেবে চট্টগ্রামের
আঞ্চলিক ভাষা অনেক সমৃদ্ধ, সংক্ষেপিত ও শ্রুতিমধুর।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অনেক বাক্যই একটি মাত্র বর্ণে প্রকাশ করা যায়, যেটি সাধারণত পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় কোনক্রমেই সম্ভব নয়। যেমন,
হ (তুমি খেয়ে নাও), দ (দিতে পারেন বা
দিয়ে দিন), য (তুমি যাও), গ
(তুমি গান গাও), ল (নিয়ে নিন বা নিতে পারেন)। ভাষা ও
খাদ্যাভ্যাস নিয়ে পরে বিশদ আলোচনার সুযোগ আছে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরস্পর
গভীরভাবে সম্পর্কিত। মূলত সাহিত্য হলো সংস্কৃতির বৃহৎ একটি অংশ। চট্টগ্রামের
লোকসাহিত্য অনেক প্রাচীন, সুপ্রতিষ্ঠিত এবং খুবই
শক্তিশালী।একটা সময় পুঁথি পাঠ আর কবির গান (তাৎক্ষণিক রচিত ও পঠিত গীতিকাব্য)
শোনার জন্য হাজার হাজার গ্রামবাসী সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বেলে নির্দিষ্ট জায়গায় সমবেত
হতো। রাতের নিস্তব্ধ আকাশের নিচে বসে পিনপতন নীরবতায় পুঁথিপাঠক আর গায়কের সুরেলা
পাঠ মাইকে শুনতে শুনতে সর্বসাধারণ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠতো, কখনো
আবার খুশিতে চোখের পাতা নেচে উঠতো। পৃথিবীর কোন অঞ্চলে সর্বসাধারণ এভাবে সাহিত্যের
মনোযোগী শ্রোতা হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত আর নেই। এখনো বৃহত্তর চট্টগ্রামের কোন কোন
নিভৃত পল্লিতে নিয়মিত বসে পুঁথিপাঠের আসর এবং কবির গানের জলসা। চট্টগ্রামের
লোকসাহিত্যের প্রধান উপাদান পুঁথিসাহিত্য নিয়ে আজীবন গবেষণা এবং সংগ্রহ অভিযান
চালিয়েছেন আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তাঁর ভাতিজা প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. আহমদ
শরিফের কল্যাণে সাহিত্যবিশারদের অধিকাংশ গবেষণা ও সংগ্রহ আলোর মুখ দেখেছে। এছাড়া
আশুতোষ চৌধুরী, আবদুর রশিদ সিদ্দিকী, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, ওহীদুল আলম, মাহবুব উল আলম, মুহাম্মদ আবদুল গফুর, আবদুল হক চৌধুরী, আবদুস সাত্তার চৌধুরী প্রমুখ
কীর্তিমান সাধক পুঁথিসাহিত্য নিয়ে কাজ করেছেন। এখনো অনেকেই এ বিষয়ে কাজ করছেন এবং
এটি আমাদের শিল্প-সাহিত্যের জন্য অতীব জরুরি। সেই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আমরা
কয়েকজন সাহিত্যকর্মী দেশব্যাপী লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করবার বিষয়ে ঐক্যমত হয়েছি।
কবি ও গবেষক সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান, সুফিসাহিত্য গবেষক
হারুণ সিদ্দিকীর সাথে যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম, সিলেট,
ময়মনসিংহ এবং রংপুর অঞ্চলের লোকান্তরিত হয়ে যাওয়া পুঁথিসাহিত্য ও
সুফিসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণা দিয়ে কার্যক্রমের সূচনা করেছি। আশা করছি ভালো কিছু
হতে যাচ্ছে।
জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের গৌরাময় সাক্ষী হিসেবে বিলুপ্তপ্রায় বা বিলুপ্তির পথে থাকা লোকসংস্কৃতিচর্চা, গবেষণা, সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা সময়ের অনিবার্য দাবি। প্রয়োজনীয় সংরক্ষণে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং বাংলা একাডেমির নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এতে আমাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেখে পরবর্তী প্রজন্ম গর্বিত হবে এবং অনুপ্রাণিত হবে।
মন্তব্য করুন