বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম অঞ্চলের যে আঞ্চলিক স্বকীয়তা এবং একুশ শতকে এসেও আঞ্চলিকতা বজায় রেখে চলার যে উদ্যমতা এখনো মানুষের মধ্যে রয়েছে, তা সত্যি বলা বাহুল্য। আধুনিক সময়ে এসে মার্শাল ম্যাকলুহ্যানের বিশ্বগ্রামের ধারণা যেভাবে আমাদের সবাইকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে, তাতে আঞ্চলিকতা টিকিয়ে রাখা অনেকটা দুষ্কর বটে। কিন্তু আমরা আঞ্চলিকতা বা স্বকীয়তা যা-ই বলি না কেন, সবকিছুই তার আপন মহিমায় উদ্বেলিত হতে বেশি সময় নেয় না বা টিকে থাকতেও কিছুর পরোয়া করে না। তেমনি যুগ যুগ ধরে আঞ্চলিক স্বকীয়তা চর্চায় টিকে রয়েছে চট্টগ্রামের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। আঞ্চলিকতা চর্চায় রেখেছে এক অনন্য নজির। বাংলাদেশে ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে অনন্য অবদান রাখা বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি, আধ্যাত্মিক শহর, বাণিজ্যিক রাজধানী, প্রাচ্যের রানি বীর প্রসবিনী, বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আঞ্চলিকতা নিয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক।
ভাষা
চট্টগ্রামে
আঞ্চলিকতা টিকে থাকার পেছনে প্রধান যা লক্ষণীয়, তা হলো এখানকার চাটগাঁইয়া ভাষা। চাটগাঁইয়া
বা চিটাইঙ্গা ভাষা হলো ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে একটি। ইন্দো-আর্য ভাষাগুলো ইন্দো-ইউরোপীয়
ভাষা পরিবারের সদস্য ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগুলোর একটি শাখা। বাংলা ভাষার সঙ্গে চাটগাঁইয়া
ভাষার একটা ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ থাকা সত্ত্বেও একে বাংলা প্রমিত ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা
হয়, যদিও ভাষাদ্বয়ের শাব্দিক ব্যবহারে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান রয়েছে। কোনো কোনো ভাষাবিদ
একে পালি ভাষার সংকর বলতে চান। চট্টগ্রামের ভাষায় প্রচুর অ্যারাবিয়ান, পর্তুগিজ, স্প্যানিশ
ও ফরাসি ভাষার শব্দ রয়েছে, কারণ তৎকালীন বণিকেরা সওদাপাতির জন্য চট্টগ্রাম বন্দরেই
প্রথম আসতেন। জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লাখ (অন্য জরিপ অনুযায়ী ১ কোটি ৭০ লাখ)
মানুষ চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে। ২০২০ সালে কানাডাভিত্তিক ওয়েবসাইট ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টে
প্রকাশিত বিশ্বের ১০০টি কথ্য ভাষার তালিকায় স্থান পায় চাটগাঁইয়া ভাষা। যেটি ১ কোটি
৩০ লাখ কথ্য ভাষাভাষী মানুষ নিয়ে পৃথিবীর ৮৮তম বৃহত্তম ভাষা ও বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষার
দিক দিয়ে প্রথম বৃহত্তম ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
চাটগাঁইয়া
ভাষার নিজস্ব কোনো অক্ষর না থাকলেও লিখনপদ্ধতি হিসেবে এটি বাংলা অক্ষর ব্যবহার করে
থাকে; যদিও এই ভাষার লিখনপদ্ধতি তেমন একটা প্রচলন নেই। চাটগাঁইয়া বুলিতেই মানুষ যুগ
যুগ ধরে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে আসছে। বলা বাহুল্য, ভাষাবিদদের অনেকে গবেষণা করে দেখেন,
বাংলা ভাষার সর্ব প্রাচীন নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ লেখা হয়েছিল চট্টগ্রামের আদি আঞ্চলিক ভাষাতেই।
চট্টগ্রামের
কিছু আঞ্চলিক ভাষা হলো:
‘তুঁই কেন আছ?’
-তুমি কেমন আছো?
‘তোঁয়ারো বাড়ি হন্ডে?’
-আপনাদের বাড়ি কোথায়?
‘তোঁয়ার লাই আঁর ফেড ফুরের!’
-আমি তোমার অভাব অনুভব করছি!
আঞ্চলিকতা নিয়ে চট্টগ্রামের এই ভাষার সঙ্গে সত্যিই
কোনো কিছুর তুলনা হয় না!
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
চট্টগ্রাম
অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রবণতা এটিকে অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা পর্যায়ে
সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। চট্টগ্রামে আরাকানি মঘিদের
প্রভাব লক্ষণীয় ছিল। সে সময় এখানকার রাজারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হওয়ায় তার প্রভাবও রয়েছে
যথেষ্ট।
এ
ছাড়া চট্টগ্রামের মানুষ আতিথেয়তার জন্য দেশবিখ্যাত। এখানকার মেজবানি স্বাদ পাওয়ার জন্য
দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এবং মানুষ তাদের ভালোমন্দ আপ্যায়নও করে। মেজবানে বিনা
মূল্যে হাজারো মানুষের আতিথেয়তা সত্যি নজিরবিহীন। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কালাভুনা
বর্তমানে দেশের সর্বত্র একটি জনপ্রিয় রেসিপিতে পরিণত হয়েছে। ভোজনবিলাসী চট্টগ্রামের
মানুষের প্রতিটি অনুষ্ঠানেই থাকে নানা পদের খাবার আয়োজন। আবার দেশের সবচেয়ে বেশি খাবার
অপচয়ের তালিকার ওপরেও রয়েছে এখানকার লোকজন।
চট্টগ্রামের
আঞ্চলিক গানের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবকে বলা হয় চট্টগ্রামের
আঞ্চলিক গানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী। আঞ্চলিক গান, মাইজভান্ডারি গান, কবিগান চট্টগ্রামের
অন্যতম ঐতিহ্য।
মধ্যযুগের
মহাকবি আলাওল, শাহ মুহাম্মদ সগীর থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের আবুল ফজল, আহমদ ছফার মতো
চট্টগ্রামের বরেণ্য কবি, লেখক তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে এখনো মানুষের মধ্যে জীবিত রয়েছেন।
দর্শনীয় স্থান
পাহাড়, নদী, সমুদ্র এবং উপত্যকায় ঘেরা চট্টগ্রাম
শহর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য প্রাচ্যের রানি হিসেবে খ্যাত। এখানে দেশের সর্ববৃহৎ
বন্দর ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। চট্টগ্রামের আঞ্চলিকতার ক্ষেত্রে এই জায়গাগুলোর
প্রভাবও রয়েছে। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত, গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত, পারকি সমুদ্রসৈকত, নেভাল
একাডেমি, চন্দ্রনাথ পাহাড়, মহামায়া লেক, ফয়’স লেক, ওয়ার সিমেট্রি, চট্টগ্রাম মিলিটারি ক্যাম্প ও পাশে
ভাটিয়ারি সানসেট পয়েন্ট, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ আরও অসংখ্য দর্শনীয় স্থান
রয়েছে। তবে আঞ্চলিকতা চর্চায় যে স্থানটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে, তা হলো চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয়। শহর থেকে খানিকটা দূরে হওয়ায় মানুষ এখানে আঞ্চলিকতা চর্চায় কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ
করে।
তা
সত্ত্বেও পরিতাপের বিষয় হলো কিছু মানুষ বর্তমানে এই আঞ্চলিকতা চর্চাকে সেকেলে মনে করে।
যার দরুন শত বছরের ঐতিহ্য চট্টগ্রামের ভাষা, সংস্কৃতি সংকটময় মুহূর্তে রয়েছে। চট্টগ্রামের
ভাষা নিয়ে মানুষের অভিযোগ তো রয়েছেই। যুগের পর যুগ মানুষ চট্টগ্রাম থেকেও এই ভাষা আয়ত্ত
করতে পারে না। এ ভাষা জন্ম থেকে আয়ত্ত করতে হয়। যে যা-ই বলুক না কেন, এটিই এখানকার
মায়ের ভাষা। বেঁচে থাকুক চাটগাঁইয়া ভাষা অনন্তকাল।
মন্তব্য করুন