আগামী ৯ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম
মুস্তফা কামাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন। আসন্ন এ বাজেট ঘোষণাকে সামনে রেখে, বর্তমান মূল্যস্ফীতিকে
অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের পরামর্শ সাধারণ মানুষের উপর মূল্যস্ফীতির
চাপ সহনীয় পর্যায়ে রাখা কিংবা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে আগামী অর্থবছরের বাজেটের মূলনীতি
হিসেবে দেখা উচিত। দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর
রহমান এবং পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট (পিআরআই)-এর গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক বাসসের
কাছে এমন মতামত তুলে ধরেছেন।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ এখন
মুল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। তাদেরকে স্বস্তি
দিতে মূল্যস্ফীতি যতটা সম্ভব সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হবে। এর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয় বাড়ানোর
পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে সুরক্ষা দেওয়াটা জরুরি।
তিনি বলেন, সরকার ১০ টাকা কেজিতে গরিব মানুষকে
চাল দিচ্ছে। নগল অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের খাদ্য সহায়তা ও নগদ সহায়তা কর্মসূচি আরও বাড়াতে হবে। এসব কর্মসূচি বাড়াতে
হলে, ভর্তুকির উপর চাপ পড়বে। যেহেতু মানুষ এখন মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে, তাই ভর্তুকিতে
বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। তিনি মনে করেন, এর জন্য
যদি বাজেটের ঘাটতি কিছুটা বাড়ে, তাহলে সেটা মেনে নেওয়ার দরকার।
দেশের জ্যেষ্ঠ এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন মূল্যস্ফীতি
নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উপর থেকে শুল্ক কর-ভ্যাট কমানোর পাশাপাশি
বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করার জন্য যে-পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সেটি ইতিবাচক। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা বাজার স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্রীয়
ব্যাংক বাজারে ডলার ছাড়ছে, এটিও অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার যে মজুদ রয়েছে,
সেটি কোনভাবেই শঙ্কাজনক নয়। তাই বাজারে যেন ডলার সংকটের কোনো স্পেকিউলেশন তৈরি না হয়,
সেজন্য প্রয়োজন মাফিক ডলার বিক্রি অব্যাহত
রাখাটা জরুরি।’ তিনি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন করা সরকারের সময়োচিত ভাল পদক্ষেপ
বলে বর্ণনা করেন।
চলতি অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত সর্বনিম্ন
আয়সীমা ৩ লাখ টাকা রয়েছে। গতবছর এটি আড়াই লাখ
টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা করা হয়। মোস্তাফিজুর
রহমান বলেন, যেহেতু গতবছর করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে, তাই এবার করমুক্ত
আয়সীমা যদি পরিবর্তন করা সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকার আয়ের যারা
আছেন, তাদেরকে ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হচ্ছে। এখানে পরিবর্তন আনা দরকার। ৫ শতাংশ করারোপের এই কাঠামো ৩ লাখ থেকে ৪ লাখে না
রেখে, ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার প্রয়োজন, যেহেতু মানুষ এখন মূল্যস্ফীতির চাপে
রয়েছে, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তাই কর কাঠামোর
এখানে পরিবর্তন আনা গেলে তারা স্বস্তি পাবে।
তিনি রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব
বোর্ড (এনবিআর)-এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং প্রাইসিং সেল ব্যবস্থা
গতিশীল করার জোরালো সুপারিশ করেন। বর্তমান
পরিস্থিতিতে উন্নয়ন বাজেটের প্রতি বেশি মনোযোগ না দিয়ে, রাজস্ব বাজেটের দিকে মনোযোগ
বাড়ানোর পরামর্শ দেন সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো। তিনি বলেন, এবার উন্নয়ন বাজেটে বেশি
মনোযোগ না দিয়ে, রাজস্ব বাজেটে মনোযোগ দেওয়া দরকার। আমদানি নির্ভর প্রকল্পের রাশ টেনে
ধরে ব্যয় কমানোর প্রয়োজন। তবে সরকার সেদিকেই
যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, চলমান প্রকল্প অগ্রাধিকার পাবে,
কিন্তু আমদানি নির্ভর নতুন প্রকল্প নেওয়া যাবে
না, এতে বৈদেশিক মুদ্রার উপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটা কমবে। এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে উল্লেখ করে
তিনি বলেন, যাঁরা রপ্তানিকারক আছেন, তাঁদের
দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি আপগ্রেডেশনের দিকে নিয়ে গেলে, যখন শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা
থাকবে না, আরো প্রতিযোগিতা-সক্ষম হতে হবে, তখন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে। তাই এসব উদ্যোগ আগামী বাজেটে থাকতে হবে। একইসাথে তিনি সুশাসনের সাথে বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা
বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেন। মোস্তাফিজুর রহমান
আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বাড়তি নজর দেওয়ারও সুপারিশ করেন।
গবেষণা সংস্থা পিআরআই-এর গবেষণা পরিচালক এবং
কমনওয়েলথ সচিবালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের সাবেক প্রধান ড. এম এ রাজ্জাকও মনে
করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আগামী বাজেটের মূলনীতি
হওয়া উচিত। তিনি বলেন, পুরো পৃথিবী জুড়ে এখন
মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। এখানেও সেটা দেখা
যাচ্ছে। তাই এবছর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিকে নিশ্চয়ই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এটার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়।
তিনি বলেন, এবছর খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে
রয়েছে। দেখতে হবে, গরীব মানুষ কিভাবে মুল্যস্ফীতির
দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদি সহজে গরীব মানুষের
কাছে খাবার পৌঁছানো যায়, তাহলে অন্তত খাদ্য নিরাপত্তাটা দেওয়া যাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই
সবচেয়ে বড় কাজ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ড. রাজ্জাক জানান, সরকার গরীব মানুষকে খাদ্যবান্ধব
কর্মসূচির আওতায় ৬২ লাখ পরিবারকে ৫ মাস ৩০ কেজি করে চাল দিচ্ছে। এর পেছনে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। এটাকে তিনি আগামী বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত
করার প্রস্তাব করে বলেন, সেটা হলে ২ কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি বলেন, এটা কিন্তু মোট বাজেট বরাদ্দের ১ শতাংশের
নিচে এবং এবার এটাই সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তিনি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি
নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আরও সম্পর্ক আছে-সরকার কৃষকদের যে ভর্তুকি দিচ্ছে, সেটা অব্যাহত
থাকতে হবে। এছাড়া মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের
জন্য অন্যান্য দেশে যেটা করা হয়, সরকার সুদের হার বৃদ্ধি করে। আমাদের এখানে যেহেতু সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে ৬ এবং ঋণের
ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা আছে, তাই এখানে সুদের হার কিছুটা বাড়িয়ে সেদিকে যাওয়ার
পরামর্শ দেন তিনি।
পিআরআই-এর এই গবেষক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে
বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমাতে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের দিকে যেতে হবে। পাশাপাশি আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়া দেশের বাইরে থেকে নমনীয় ঋণ পেতে দর–কষাকষি
করা যেতে পারে। তিনি বলেন, বরাবর আমাদের শিক্ষা
ও স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ যথেষ্ট অপ্রতুল। এখানে
গুণগত বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ব্যয়টাও গুণগত হতে
হবে। তিনি বলেন, কোভিডের আগে ২০১৯ সালে ৯০
ভাগের বেশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছিল, কিন্তু গত ২ বছর ৮০
ভাগের বেশি খরচ করতে পারছে না। তাই বাজেট বাস্তবায়নের
উপর নজর দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি সেটা অব্যশই গুণগত হতে হবে।
ড. রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ জিডিপির মাত্র ২১ শতাংশ এবং ঋণের সুদ যথেষ্ট সহনীয় পর্যায়ে আছে। সেখানে চিন্তার তেমন কারণ নেই। তবে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অনেক বেশি ঋণ করছে। এর জন্য অনেক বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বাজেটের প্রায় ১১ শতাংশের সমান। তিনি দেশীয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ কমানোর পরামর্শ দেন, পাশাপাশি তিনি বাজেটে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নতুন পদক্ষেপ গ্রহণেরও সুপারিশ করেন।
মন্তব্য করুন